নিউজ ডেস্ক | BangaAkhbar.in
প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই স্বীকার করতে হয়, গতকালকের কল্পনা আজকে যেমন বাস্তব, একই সঙ্গে গতকালকের সম্ভাবনা আজকে সেটা বিপদ—
উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রযুক্তির অনন্য অবদান। রোবোটিক সার্জারি, টেলিমেডিসিন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (AI) মাধ্যমে রোগ নির্ণয়— একসময়ে যা কল্পনাতীত ছিল, আজ তা হাতের মুঠোয়।
বর্তমান ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রযুক্তি আর আমাদের দৈনন্দিন জীবন যেন এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। আজকের দিনটি, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অতীতের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। টেকনোলজির অগ্রগতির ফলে পৃথিবী যেন এক নতুন দিগন্তের খোঁজে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে, কাজের মিটিং, শিক্ষা গ্রহণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা অবসর যাপন—প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির স্পর্শ স্পষ্ট। এক কথায় মানব সভ্যতার ইতিহাস প্রযুক্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে। দ্রুত পরিবর্তিত জীবনের ছন্দে প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগের ধরন, কাজের পদ্ধতি, শেখার উপায়, এমনকি মানসিক সুস্থতার ধারণাকেও আমূল বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতিতে মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি দিক পরিবর্তিত হয়েছে। দিগ্বিজয়ী এই অগ্রগমন যেমন এনে দিয়েছে সুবিধা, তেমনি তৈরি করেছে নব্য সংকট ও নৈতিক প্রশ্ন। অনস্বীকার্যভাবে, প্রযুক্তির এই অগ্রগতি একদিকে যেমন সময় বাঁচিয়েছে, দক্ষতা বাড়িয়েছে, উদ্ভাবনের দিগন্ত খুলেছে, অন্যদিকে বাড়িয়েছে মানসিক চাপ, তথ্য নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং ডিজিটাল আসক্তির ঝুঁকি।
আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটেও প্রযুক্তির অগ্রগতি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সাইবার গোয়েন্দা সরঞ্জামের বিকাশ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে। ড্রোন, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সামরিক অভিযান এতটাই নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে যে, সৈনিকদের সরাসরি জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে না। কিন্তু এই উন্নতির অন্ধকার দিকটি উদ্বেগজনক। আধুনিক যুদ্ধ ক্রমশ নিরুত্তাপ এবং এতটাই দূরনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে যে প্রায়শই সীমিত জবাবদিহিতা ও তত্ত্বাবধানের মধ্যে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে চালিত ড্রোন মারাত্মক হামলা করে পৃথিবীর কোনো একপ্রান্তে থাকা ভূখণ্ডকে মুহূর্তেই নাস্তানাবুদ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি, সাইবার যুদ্ধের উত্থান সংঘাতের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে, যেখানে একটিও গুলি না ছুড়ে দেশের পাওয়ার গ্রিড, আর্থিক ব্যবস্থা কিংবা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
প্রযুক্তির উন্নতি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব হয়েছে— কিন্তু এই অতিসংযোগের মাঝেও তৈরি হয়েছে একাকীত্বের বৃত্ত। হৃদয়ের আসল সংযোগ হয়ে উঠেছে ক্রমশ দুর্লভ। যার প্রভাবে আজকের প্রজন্মের বড় একটা অংশ দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে স্ক্রিনের সামনে। ভার্চুয়াল জগতে আমরা যত এগিয়ে যাচ্ছি, বাস্তব স্পর্শ তত হারিয়ে ফেলছি জীবনের আসল সম্পর্কের উষ্ণতা। গবেষণা বলছে, ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক মানসিক অবসাদ। অনলাইনের ঝাঁ-চকচকে জীবনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের গরমিল সৃষ্টি করে হতাশা। এই বৈপরীত্যই প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাবের অন্যতম প্রতিচ্ছবি। তাই প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব অনেকটা নিউটন এর তৃতীয় সুত্র কিংবা ভর সংরক্ষন এর সুত্রের মতো। প্রযুক্তির অগ্রগতির স্মারক হিসেবে আমরা যা অর্জন করছি, তার বিনিময়ে অনেক কিছুই হারাচ্ছি—কখনও সময়, কখনও সম্পর্ক, কখনওবা মানসিক শান্তি।
যেমন প্রযুক্তি কখনও আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা, আবার কখনও সেই একই প্রযুক্তি ডেকে এনেছে বিপর্যয়ের অশনি সংকেত।। এই পরিবর্তন যেমন সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জও।
প্রযুক্তি যেমন একদিকে আমাদের জীবনকে সহজ থেকে সহজতর করেছে, ঠিক অপরদিকে সৃষ্টি করেছে অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি এবং কখনও কখনও মানবিক সম্পর্কের অস্থিরতা। তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে— প্রযুক্তির কি আমাদের উন্নয়নের পথপ্রদর্শক, নাকি ধ্বংসের আলিঙ্গন? প্রযুক্তি কী শুধুই আধুনিক জীবনের আশীর্বাদ? না কি এটি অভিশাপও?
কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব : সম্ভাবনা ও সংকট
কালের আবর্তে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছে কর্মক্ষেত্রের সংজ্ঞা। এক সময় অফিস মানেই ছিল চার দেয়ালের আড়ালে এক নির্দিষ্ট দপ্তর আর বাঁধাধরা সময়ের শৃঙ্খল। কর্মক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি গড়ে তুলেছে বৈশ্বিক সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায়। আজকে ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ও রিমোট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের সৌজন্যে দেয়ালের গণ্ডি ছাড়িয়ে কাজ পৌঁছে গিয়েছে ঘরের এক কোণে। আঙুলের স্পর্শে ডেস্কটপের পর্দায় ফুটে উঠেছে সভাকক্ষের নকশা। অটোমেশনের মুকুটে একের পর এক পালক যোগ হয়েছে — উৎপাদনশীলতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে — মেশিনের নিখুঁত দক্ষতায় সংক্ষিপ্ত হয়েছে মানবিক শ্রমের পরিধি।
তবে প্রযুক্তির এই বিজয়গাথার আড়ালে জমেছে অনিশ্চয়তার এক নতুন সংশয়। নিত্যনতুন সফটওয়্যার আর সিস্টেম পরিবর্তনের দৌড়ে কাঁধে চেপেছে এক অদৃশ্য বোঝা। একদিকে দক্ষতার মানদণ্ড ক্রমাগত উঁচুতে উঠছে, অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসে ধরছে চিড়— অশান্তির ছায়া পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যেও। ক্লান্তির ভারে নুইয়ে পড়ছে কর্পোরেট করিডর, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের সূক্ষ্ম বিভাজনরেখা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। যান্ত্রিকতায় মোড়া এই কর্মসংস্কৃতি সম্পর্কের উষ্ণতা কমিয়ে যেন ধীরে ধীরে জন্ম দিচ্ছে নিঃসঙ্গতার এক অদৃশ্য প্রাচীর। অপরদিকে, অটোমেশন ও এআই-এর অগ্রগতিতে কর্মসংস্থানে দেখা দিচ্ছে অশনি সংকেত।
ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের মানচিত্র আঁকতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা আজ বলছেন— পরবর্তী লড়াই শুধু দক্ষতার নয়, সমানভাবে মানসিক স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখারও। মেশিনের নিরলস নিরপেক্ষতার সামনে মানুষের সৃজনশীলতা কি আদৌ টিকে থাকবে? নাকি একদিন সব কাজ-ই কৃত্রিমতার নির্বিকার স্পর্শে রূপান্তরিত হবে?
এই অনিশ্চয়তায় অদূর ভবিষ্যতের দিগন্তে বেঁধেছে এক অস্বস্তির দানা। প্রযুক্তি যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি অগোচরে প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব এ সংকটের কুণ্ডলীও পাকিয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির বিপ্লব
টেলিমেডিসিন, পরিধানযোগ্য হেলথ ডিভাইস এবং এআই-নির্ভর ডায়াগনস্টিক টুল আজ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সুলভ, দ্রুত ও ব্যক্তিকৃত করে তুলেছে। ঘরে বসেই এখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়া সম্ভব। ফিটনেস ট্র্যাকার, স্মার্টওয়াচের মাধ্যমে মুহূর্তে জানা যাচ্ছে হার্ট রেট, ঘুমের মান বা রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: এই স্বাস্থ্য ডেটার মালিকানা কার হাতে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানবিক সূক্ষ্মতার কাছে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য? প্রযুক্তি আর নীতির টানাপোড়েনে এখন নতুন সংলাপের সূচনা জরুরি।
স্বাস্থ্যসেবায় এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যেমন রোগ নির্ণয়ের গতি ও নির্ভুলতা বাড়িয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও জাগিয়েছে। অ্যাপ-ভিত্তিক হেলথ মনিটরিং এখন রোগ প্রতিরোধে নতুন দিগন্ত খুলেছে। তবে এই ডেটা কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
গ্রামীণ এলাকায় টেলিমেডিসিন যেন এক নতুন আশার আলো। যেখানে আগে চিকিৎসা ছিল দূরের স্বপ্ন, এখন মোবাইল ইন্টারনেটেই মিলছে প্রেসক্রিপশন। পাশাপাশি, এআই ডায়াগনস্টিক টুল রোগ নির্ণয়ে ডাক্তারদের সহায়তা করছে, বিশেষত যখন মানব সম্পদের ঘাটতি থাকে।
তবু, প্রযুক্তির অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং তার ব্যবহারিক ও নৈতিক দিকগুলো নিয়ে ভাবনা-চিন্তা এখন সময়ের দাবি। আমাদের দরকার এমন এক স্বাস্থ্য নীতিমালা যেখানে প্রযুক্তি ও মানবিকতা হাতে-হাত রেখে এগিয়ে চলবে। স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ যেন কেবল যান্ত্রিক না হয়ে ওঠে—সেই চেষ্টাই হোক আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ ও অঙ্গীকার।
শিক্ষায় প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব
‘গ্লোবাল ভিলেজ’ শব্দবন্ধটি আজ আর কবিতার অলংকার নয়, প্রযুক্তির বাস্তব প্রতিফলন। অনলাইন শিক্ষা, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম, ডিজিটাল লাইব্রেরি— সবই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ এখন পৌঁছে যাচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্রের মোবাইলে। মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। তথ্যের এমন প্রবাহ, এমন অবাধ প্রবেশাধিকার মানব ইতিহাসে ছিল দুর্লভ।
প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেমন স্পষ্ট, তেমনি শিক্ষার জগতেও এনে দিয়েছে এক নতুন জোয়ার। আজ আর পড়াশোনা কেবল স্কুল-কলেজের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্টারনেটের সাহায্যে ঘরে বসেই দেশ-বিদেশের সেরা শিক্ষকের পাঠ হয়েছে সহজলভ্য। ভার্চুয়াল ক্লাস, অনলাইন কোর্স, ইন্টার্যাক্টিভ অ্যাপ — এ সব যেন আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে শিক্ষার এক নতুন দিগন্ত। কিন্তু এই আশীর্বাদের ছায়ার নীচে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তির এক অন্ধকার দিক। প্রথমত, ইন্টারনেটের সমস্ত তথ্য নির্ভুল এমন নই। অগোচরেই ভুয়ো খবর আর ভুল তথ্য আমাদের মনের ভিতর গেঁথে যায়। না জেনেই আমরা ভুল শিখি, ভুল বুঝি। সেই ভুলই আবার নতুন ভুলের জন্ম দেয়।
এছাড়াও, অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক ছেলে মেয়েরা এখনো উন্নত প্রযুক্তি ও শিক্ষার সমপরিমাণ লাভ উঠাতে পারেনা। আজও একটা মোবাইল, একটা ভালো ইন্টারনেট সংযোগ অনেকের কাছে স্বপ্ন। ফলে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য বিভাজন। তাছাড়া প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনোযোগের অভাব এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গেমস ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগী করে তুলছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে তাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই বলাবাহুল্য শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব বিরাজমান। প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ এবং সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও সঠিক ও কার্যকরী করা সম্ভব হবে।
জিবনযাপনে প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব
আজকের স্মার্ট হোম ডিভাইস যেমন ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, স্বয়ংক্রিয় লাইটিং সিস্টেম, দৈনন্দিন কাজের গতি এবং জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্য — যেন অতীতের এক রূপকথা। ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ঘরের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চালানো এখন শুধু একটি আদেশ -এর দূরত্বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) মিলিয়ে গঠিত এই স্মার্ট জীবনযাপন আমাদের সময়, শ্রম এবং শক্তি বাঁচাতে সাহায্য করছে।
তবে এর ব্যবহারে বাড়ছে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও। স্মার্ট ডিভাইসগুলির আন্তঃসংযোগ একটি ছোট্ট ত্রুটিতেই পুরো নেটওয়ার্ক বিপদে ফেলতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। নিরাপত্তা সচেতনতা ছাড়া স্মার্ট জীবনযাপন হতে পারে প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাবের এক সুগভীর ফাঁদ।
প্রযুক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণে অতিসহজ হয়েছে তথ্যের প্রবাহ যা আজ পরিণত হয়েছে এক নীরব ঝুঁকিতে, যেখানে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। ভুয়ো খবরের (Fake News) বিস্তার, বিভ্রান্তিকর প্রচার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার হুমকি— এই সবই প্রযুক্তির অন্ধকার দিক। একটি বিভ্রান্তিকর মেসেজ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে লক্ষাধিক মানুষের কাছে, যার ফল বাড়ছে সামাজিক উত্তেজনা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা।
তথ্য যাচাই ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মূর্খের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মতো—যার পরিনাম অতি ভয়ঙ্কর হতে পারে। তাই আজকের দিনে প্রযুক্তিকে শুধুমাত্র ব্যবহার নয়, বরং সঠিকভাবে বুঝে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। নৈতিক সচেতনতা, ডিজিটাল লিটারেসি এবং সাইবার সুরক্ষার জ্ঞান না থাকলে আধুনিক জীবনযাপন অনিচ্ছায় প্রযুক্তির ফাঁদে পরিণত হতে পারে।
প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব ও পরিবেশ দূষণ
প্রযুক্তির অনবদ্য অগ্রগতি যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি পিছনে ফেলে গেছে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের (E-Waste) বিশাল স্তুপ। প্রতি বছর টন টন ইলেকট্রনিক আবর্জনা জমছে পৃথিবীর বুকে, যার যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ।
- নতুন ডিভাইস কিনলেই তার সাথে আসে প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং বর্জ্য—যেগুলো জৈব-অপচনশীল এবং খুব কমই রিসাইকেল হয়। ই-কমার্সের প্রসারের সাথে এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
- স্মার্টফোন, ব্যাটারি, চিপস তৈরিতে ব্যবহৃত ‘রেয়ার আর্থ মেটাল’ যেমন লিথিয়াম, কোল্টান, কপার ইত্যাদির জন্য পরিবেশে বিধ্বংসী খনন চলছে, কেটে ফেলা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ গাছ। পরিণতি বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় ও ভারসাম্ম্যহীন ইকোসিস্টেম এবং স্থানীয় জনজীবনে বিপর্যয়।
- ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বিশেষত মোবাইল কোম্পানিগুলো প্রায়শই এমনভাবে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ডিজাইন করে, যা ১-২ বছরের মধ্যেই ‘পুরনো’ বা ‘স্লো’ হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ মার্কেটে নতুন ডিভাইস আসে, আর পুরোনো ডিভাইস পরিত্যাক্ত ই-বর্জ্যের পাহাড় তৈরী করে। এইসব ডিভাইসের ব্যাটারি, সার্কিট বোর্ড এবং ডিসপ্লেতে থাকা সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামসহ নানা বিষাক্ত ধাতু ধীরে ধীরে মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করা, কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির মানের অবনতি, এমনকি বায়ু দূষণ—সবই প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব এর এক অনিবার্য পরিণতি।
- মোবাইল টাওয়ার, ওয়াই-ফাই রাউটার, ব্লুটুথ গ্যাজেট থেকে বের হওয়া অতিমাত্রায় ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
- স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও স্পেস টেকনোলজির বিস্তারের ফলে ‘স্পেস জাঙ্ক’ বা মহাকাশ আবর্জনা তৈরি হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যত বিপজ্জনক হতে পারে।
আর এই সংকটকে উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অসুরক্ষিত পৃথিবী রেখে যাওয়া।
তাই প্রযুক্তিকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য আমাদের এখনই নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার—না হলে প্রযুক্তির অগ্রগতি নিজেই হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত বিপর্যয়।
প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব – আশীর্বাদ না অভিশাপ?

বিশ্লেষণ করে দেখা যায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র কিংবা সম্পর্ক—প্রতিটি পরিসরে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে—ঠিক উল্টো দিকে প্রযুক্তিকে উন্নত করতে গিয়ে সাস্থ, জীবন এর আসল সুখ শান্তি, চিন্তাশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, এবং সর্বোপরি অন্যান্য জীবজগতের উপর কুঠারাঘাত করেছি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে এক অজানা বিপদ এর মুখে ঠেলে দিয়েছি ।
যে প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবা কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থা কে সহজ থেকে সহজতর করেছে, সেই একই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে আমাদের সাস্থের চরম অবনতি ঘটেছে।
যেমন স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার রোগ নির্ণয়ে গতি এনেছে, জীবন বাঁচিয়েছে, আবার সেই প্রযুক্তির উদ্ভূত সরঞ্জাম ব্যবহারে আমাদের হাটাচলা খেলাধুলা ও শরীরচর্চা কমেছে, তাই শরীরে জমেছে চর্বি, বেড়েছে সুগার এর মাত্রা।
শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব দেখা গেছে। কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কাজের উৎপাদনশীলতা যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের মানসিক চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও একাকীত্বও বেড়েছে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি আমাদের জোড়া লাগিয়েছে স্ক্রিনের মাধ্যমে, কিন্তু কেটেছে হৃদেয় সুতো।
এই বৈপরীত্যই প্রযুক্তির আসল রূপ—যেখানে প্রতিটি সুবিধার পেছনে লুকিয়ে থাকে অবক্ষয়, প্রতিটি অগ্রগতির পাশে থাকে এক নৈরাশ্য। তাই, প্রযুক্তি আমাদের জন্য শুধুই আশীর্বাদ নয়, বরং এটি এক দ্বিধাময় বাস্তবতা—যার সঠিক ব্যবহার আমাদের উন্নতির চাবিকাঠি, আর অপব্যবহার ডেকে আনতে পারে পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়।
সুতরাং, প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হওয়া উচিত সচেতন, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল। কারণ প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ—এর প্রভাব নির্ভর করে আমরা কীভাবে এর ব্যবহার করি। আমরা যদি এর ব্যবহারে মানবিকতা, নীতি ও সচেতনতা বজায় রাখতে পারি, তবে প্রযুক্তিই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যতের সর্বশ্রেষ্ঠ সহযাত্রী।
🌐 আরও পড়ুন @ https://bangaakhbar.in/
1 thought on “প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব”